সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পনেরোই আগস্ট

পঞ্চাশ বছর আমাদের জীবনের অনেকখানি সময়। সেদিন ঠিক এই সময়ে আমি গোলাপবাগে হিউম্যানিটিজ বিল্ডিংস-এর সামনে অপেক্ষা করছি বন্ধুদের জন্য। আমার দায়িত্ব ছিল জাতীয় পতাকা নিয়ে প্রস্তুত থাকা। পতাকা উত্তোলনের জন্য খুঁটি , দড়ি ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আসবেন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার জন্য। এক এক করে বন্ধুরা এসে জড় হতে লাগল। আসলে এই দায়িত্ব ছিল ছাত্র সংসদের। এস এফ আই-এর ইউনিয়ন। তারা আগের বছর এই দিনটি পালন করে নি। ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিল অমিয় সাহা। আমরা এক ক্লাশেই পড়তাম। ব্যক্তিগত বন্ধু। ওর কাছে জানতে চাইলাম ওরা স্বাধীনতা দিবস পালন করবে কি না। অমিয় বলল,' এই স্বাধীনতাকে আমরা প্রকৃত স্বাধীনতা বলে স্বীকার করি না।'' আমি বললাম,' আমরা কাল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে স্বাধীনতা দিবস পালন করছি। ইউনিয়ন যেহেতু করছে না, আমরাই দায়িত্ব নিচ্ছি। এলে খুশি হব।'
পনেরোই আগস্ট কিছুক্ষণ পরে অমিয় তার দল্বল নিয়ে এল এবং আমি যেখানে জাতীয় পতাকা রেডি করে রেখেছিলাম তার দশ হাত দূরে গর্ত খুঁড়তে শুরু করল। আমি বিস্মিত হয়ে ওদের কাছে গিয়ে বললাম,' দুটো পতাকা খুব দৃষ্টিকটু লাগবে আজকের দিনে। এক কাজ করা, অনুষ্ঠানটা তোরাই পরিচালনা কর। সেটাই শোভন হবে।'' অমিয়র বন্ধু মানিক আমারও বন্ধু। সে বলল,' আমরা লাল পতাকা উত্তোলন করব। আজকের দিনটা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবস রূপে পালন করব। এই ঝুটা আজাদি আমরা মানি না।'
#
সেদিন তারপর কি হয়েছিল সে কথা থাক। পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে সেদিনের সেই সব বন্ধুদের অনেকের সাথেই নানাভাবে সম্পর্ক থেকেছে। কেউ কেউ এখনো ব্যক্তিগত বন্ধু। পরিভাষায় যাকে বলে on the other side of the hedge এদের অনেককে দেখার সুযোগ হয়েছে। এম এল এ, এম পি, মন্ত্রী এবং নানা দায়িত্বপূর্ণ পদে আসীন পদাধিকারীরূপে এদের অনেককে দেখেছি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে, মুস্টিবদ্ধ হস্ত উত্তোলন করে অভিভাদন জানাতে, গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে। অমিয়র সঙ্গে দেখা হয়েছে। সেদিনের স্মৃতি নিয়ে আমরা বন্ধুর মত কথা বলেছি। একসঙ্গে সময় কাটিয়েছি নানা সুখদুখের আলোচনায়।
#
শামসুর রহমানের কবিতায় পড়েছি--'জীবন জটিল বড়'/ অরণ্যের মত জায়মান'।
এই স্বাধীনতা আমাদের স্বর্গসুখ এনে দেয় নি। কিন্ত হীনমন্যতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখনো অনেক দূরের পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। প্রতি মুহূর্তের সতর্কতা প্রয়োজন। আমি কি করতে পারি-শুধু লেকচারবাজি ছাড়া- সে ভাবনা এবং ভাবনা অনুযায়ী কাজের দায়ীত্ব নেওয়াও জরুরী। স্বাধীনতা কেউ উপহার দেয় না।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সত্যম বদ প্রিয়ম বদঃ অপ্রিয়ম সত্যম মা বদ

সত্যম বদ প্রিয়ম বদঃ অপ্রিয়ম সত্যম মা বদ ছোটো বয়সে সংস্কৃত ক্লাশে অনুবাদ করেছিলামঃ সত্যম বদ প্রিয়ম বদঃ অপ্রিয়ম সত্যম মা বদ। মনের মধ্যে খটকা এখনো লেগে আছে। সত্য সবসময় 'প্রিয়' হবে এমন কোনো মানে নেই। লোকের মন রাখতে গিয়ে মিথ্যে বা অর্ধ সত্যের চাষ করে যেতে হবে। তারপর আমরা একটা সুস্থ সমাজ চাইব!  মাঝে মাঝেই দেখি আমি হয়তো কোনো বন্ধুর পোষ্টে কিছু মন্তব্য করেছি যা সত্য কিন্তু তার মনঃপূত নয়। কিছুক্ষণ পর দেখি আমার মন্তব্য ডিলিট করে দিয়েছে। আমি হয়তো আর সেখানে কিছু মন্তব্য করব না বা তাকে আনফ্রেন্ড করব না ( তার স্তরে আমি কেন নামবো ?) কিন্ত সত্য কি ডিলিট করা যাবে? একটা তর্ক প্রায় শুনি- আমার সত্য বনা্ম তোমার সত্য। আমার হাসি পায়। সত্যের স্বরূপ তুমি- আমি -স্বাপেক্ষ নয়।

কেমন আছে শহর বর্ধমান ?......( আপাতত শেষ পর্ব)

কেমন আছে শহর বর্ধমান ? ......( আপাতত শেষ পর্ব)  কিভাবে লুপ্তোদ্ধার সম্ভব? না, এই এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠা শহরের লুপ্তোদ্ধার সম্ভব নয়। প্রথমেই এই কথাটা বলে রাখা ভাল। কিছু মেরামত করা সম্ভব। এখনই যদি সদর্থক উদ্যোগ নেওয়া যায় তাহলে এই শহরের শ্রী ও স্বাস্থ কিছু পরিমাণে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এ বিষয়ে নানাজনের সাথে আলোচনা করে আমার কিছু কথা মনে হয়েছে। এখানে সেই কথাগুলি সংক্ষেপে বলতে চাই। অনেকদিন ধরে নানাসূত্র থেকে আমি কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম। আমার অসাবধানতার কারণে আমার ল্যাপটপটি নিশিকুটুম্ব নিয়ে গেছে। আমার সংগৃহীত যাবতীয় তথ্যও সেইসঙ্গে চলে গেছে। ফলে তথ্যসহ কথা বলা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। আমি গত দুতিনদিন ধরে বর্ধমান মিউনিসিপ্যালিটী ও বর্ধমান ডেভেলপমেন্ট অথরিটির ওয়েবসাইট খুঁজলাম । দরকারী তথ্য পেলাম না। এই দুই সংস্থা আমাদের এই প্রিয় শহরের উন্নতির জন্য কি কি পরিকল্পনা রচনা করেছেন জানতে পারলে সুবিধা হোত। লক্ষ্য করে দেখবেন আমি আমার প্রতিবেদন ও ব্যাখ্যায় রাজনৈতিক দোষারোপের মধ্যে নিজেকে জড়াই নি। আমি বুঝেছি এই দোষ আমাদের সকলের। ব্যক্তি মানুষের লোভ ও স্বার্থচিন্তা সমানভাবে দায়ী এই শহরের এই বর্তমান অবস্থ...

কেমন আছে শহর বর্ধমান ?......( নয় )

কেমন আছে শহর বর্ধমান ? ......( নয় ) এ শহর কি জতুগৃহ হবে? আমি যখন ‘বর্ধমান সমাচার’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলাম তখন থেকেই মাথায় প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে। এই শহরের সারা অবয়ব জুড়ে “সুপার মার্কেট” তৈরি হতে শুরু করেছে উনিশশো নব্বইয়ের দশক থেকেই। সুপার মার্কেট বলতে যে ঝা চকচকে একটা ছবি মানসচক্ষে ভেসে ওঠে এগুলি তার অত্যন্ত ‘দরিদ্র আত্মীয়’ সংস্করণ । ভেতরে ঢুকে এক রাস্তা থেকে আর এক রাস্তায় ঢুকতে গেলে অবশ্যই ধাক্কা খাবেন উল্টোমুখে আসা অন্য কারো সাথে। নেই আরো কতকিছু। সব থেকে বড় কথা এইসব মার্কেটে আগুণ লাগলে দমকল ঢুকতে পারবে না। যদিবা কোন কৌশলে জলের পাইপ নিয়ে যাওয়া যায় জল কোথায়? আশেপাশের পুকুরগুলি ‘পুকুর চুরি’ হয়ে গেছে। এমন কি বাঁকার পাড়েও যদি বসতি এলাকায় আগুণ লাগে কোনদিন জল পাওয়া যাবে না। সারা শহরটা স্থান বিশেষে খান্ডব বন ও জতুগৃহের রূপ নিয়েছে। # অনেক কথা বলার চেস্টা করলাম। আরো অনেক বেশি কথা বলা হোল না। স্মৃতি নির্ভর লেখার এই এক মুস্কিল। লেখা প্রকাশিত হবার পর মনে হয়,’ আরে এই খানটায় এই তথ্য বাদ গেছে; এখানটা অন্যভাবে লেখা যেত ।‘ না, এখন ভেবে লাভ নেই। দুয়েকটা কথা ব্যক্তিগত কৈফিয়ত হিসাবে বলার...